ভারতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন জাহাজে রুশ জ্বালানি তেল আমদানির অভিযোগ

নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জাহাজের মাধ্যমে বহন করা রুশ জ্বালানি তেল কিনেছে ভারতীয় স্টিল টাইকুন লক্ষ্মী মিত্তাল ও ভারত সরকারের যৌথ জ্বালানি উদ্যোগ এইচএমইএল।

নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জাহাজের মাধ্যমে বহন করা রুশ জ্বালানি তেল কিনেছে ভারতীয় স্টিল টাইকুন লক্ষ্মী মিত্তাল ও ভারত সরকারের যৌথ জ্বালানি উদ্যোগ এইচএমইএল। স্যাটেলাইট চিত্র, শিপিং ডাটা ও কাস্টমস নথি বিশ্লেষণ করে এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এফটি। সেখানে বলা হচ্ছে, মিত্তাল এনার্জির মালিকানাধীন বৃহৎ পরিশোধনাগার পাঞ্জাবের গুরু গোবিন্দ সিং রিফাইনারি চলতি বছর অন্তত চারটি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চালান গ্রহণ করেছে। এইচএমইএলের মাধ্যমে এ জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এসব পণ্যের সম্মিলিত মূল্য প্রায় ২৮ কোটি ডলার।

চালানগুলো রাশিয়ার মুরমানস্ক বন্দর থেকে ওমান উপসাগর পর্যন্ত নিয়ে আসে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জাহাজ। যাত্রার শেষ ধাপটি সম্পন্ন করে সামাধা নামের একটি ট্যাংকার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় না থাকলেও এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) কালো তালিকাভুক্ত।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গতিবিধি গোপন রাখতে সব জাহাজই বিভ্রান্তিকর পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। কোনো জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখেছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুয়া অবস্থান দেখানো হয়েছে।

চালানগুলোর তথ্য এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন রুশ জ্বালানি তেল না কিনতে ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে রাশিয়ার বৃহত্তম দুই জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী রসনেফট ও লুকঅয়েলের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন।

এফটি চিহ্নিত চারটি চালান একই ধরনের ছিল। সেখানে দেখা যায়, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় মুন্দ্রা বন্দর থেকে যাত্রা করে সামাধা। ট্রান্সপন্ডার সিগন্যাল অনুযায়ী, ওমান থেকে জ্বালানি তেল আনা হয়েছে। কিন্তু স্যাটেলাইট চিত্র বলছে, ওমান উপসাগরের আরো গভীরে গিয়ে জাহাজ থেকে জাহাজে জ্বালানি তেল স্থানান্তর করেছে। সামাধার পাশে দেখা যাওয়া ট্যাংকারগুলো ছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত বেলগোরড, দানসু, ডিগনিট ও প্রাইমোয়ে।

ওমান উপসাগরে জ্বালানি তেল স্থানান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ট্যাংকার ট্র্যাকার্স। ইরানি জ্বালানি তেলের গোপন স্থানান্তরের জন্য অঞ্চলটি সাধারণত নজরদারিতে থাকে।

সেপ্টেম্বরে সামাধা জানিয়েছিল, জ্বালানি তেল আনতে ওমান যাচ্ছে। অন্যদিকে স্যাটেলাইট তথ্য দেখায়, জাহাজটি প্রায়ই স্পুফিং বা ভুয়া অবস্থানের সংকেত পাঠিয়েছে। রুশ জাহাজ বেলগোরড ওমান উপসাগরে ঢুকে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দিত। ফলে ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ত। কিন্তু স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়ে দুই জাহাজ পাশাপাশি অবস্থান করছে। এটি সামাধা ঘোষিত অবস্থান থেকে সাত নটিক্যাল মাইল দূরে।

বিশ্বের বৃহত্তম সমন্বিত স্টিল ও খনি গ্রুপ আর্সেলর মিত্তালের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মী মিত্তাল। তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিশ্বব্যাপী ছড়ানো। ২০০৮ সাল থেকে মার্কিন ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গেও যুক্ত তিনি।

মিত্তাল গ্রুপ ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেডের (এইচপিসিএল) যৌথ উদ্যোগ এইচএমইএল। প্রথমে কোনো মন্তব্য করতে না চাইলেও সংবাদ প্রকাশের পর এতে ভারতের স্থানীয় নিয়মকানুন পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়েছি বলে দাবি করে কোম্পানিটি। এইচএমইএল বলছে, যথাযথ যাচাই ও কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে তারা। তারা যে শর্তে তেল কিনেছে, তাতে অন্য জাহাজগুলোর বিস্তারিত জানানো হয়নি। কিংবা এসব জাহাজ অবস্থান গোপন করেছে কিনা সে বিষয়েও তারা অবগত ছিল না।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ করে রাশিয়া। এর পর থেকে রুশ জ্বালানি তেলের অন্যতম বৃহত্তম ক্রেতা হয়ে ওঠে ভারত। মূল্যছাড়ও পেয়ে আসছে দেশটি। ডাটা অ্যানালিটিকস গ্রুপ কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া সমুদ্রপথে চলতি বছর গড়ে দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল রফিতানি করেছে, যার মধ্যে ১৭ লাখ ব্যারেল গেছে ভারতে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির পরিচালক এবং সাবেক মার্কিন বাণিজ্য ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা এমিলি কিলক্রিস বলেন, ‘রুশ জ্বালানি তেলের বড় ক্রেতারা জানে কিছুটা ঝুঁকি আছে। তবু মূল্যের কারণে তারা মার্কিন ট্রেজারির নজরে পড়ার ঝুঁকি নিতে রাজি।’

সামাধার মালিক ও ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান এরিকা ফ্রেইট লিমিটেডের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হয়নি এফটি। কোম্পানিটি সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। সম্প্রতি সামাধাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাহাজটি নিবন্ধন হয়েছে সেশেলসে, যেখানে আরো ১৩টি কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নিবন্ধিত রয়েছে। এসব জাহাজের প্রকৃত মালিকানা গোপন থাকায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন।

আরও